প্রাচীন মানুষের ভাবনায় ভূমিকম্প - Vice Daily

Page Nav

HIDE

Grid Style

GRID_STYLE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

প্রাচীন মানুষের ভাবনায় ভূমিকম্প

মানবসৃষ্ট দুর্যোগের বাইরে প্রকৃতিসৃষ্ট সবচেয়ে প্রলয়ংকরী দুর্যোগের নাম ভূমিকম্প। মানব সভ্যতার উষালগ্ন থেকে ভূমিকম্পের অনেক নজির মানুষের হাতে ইতোমধ্যেই রয়েছে। বিশাল সব প্রতাপশালী শহর ভূমিকম্পে ধূলিস্যাত হয়ে যাবার কথাও আমরা জানি। স…

মানবসৃষ্ট দুর্যোগের বাইরে প্রকৃতিসৃষ্ট সবচেয়ে প্রলয়ংকরী দুর্যোগের নাম ভূমিকম্প। মানব সভ্যতার উষালগ্ন থেকে ভূমিকম্পের অনেক নজির মানুষের হাতে ইতোমধ্যেই রয়েছে। বিশাল সব প্রতাপশালী শহর ভূমিকম্পে ধূলিস্যাত হয়ে যাবার কথাও আমরা জানি। সেই থেকে মানুষের মাঝে ভূমিকম্প নিয়ে আছে এক আজন্ম ভীতি। যে ভীতি স্থান-কাল ভেদে নানান ব্যাখ্যা বা আখ্যায় চিত্রিত হয়েছে। কোথাও ভূমিকম্প ঈশ্বরের ক্রোধ, আবার কোথাও বা শক্তির প্রকাশ।
তবে মানবসভ্যতার ইতিহাস আমাদের জানায়, প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েই মানুষ নিজেকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে নিত্য নতুন অনেক বস্তুকেন্দ্রিক আবিষ্কারের পেছনে ছুটছে। আজ মানুষ মহাকাশ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেও, ভূমিকম্প বন্ধ বা এ সম্পর্কে কোনো অগ্রগতি নেই মানুষের। এমনটি ভূমিকম্প কখন কোথায় আঘাত হানতে পারে সেই সম্ভাবনাটুকু মানুষ আজও আবিষ্কার করতে পারেনি। অর্থাৎ প্রাচীন মানুষের ভূমিকম্প ভাবনা থেকে বর্তমান মানুষের ভূমিকম্প ভাবনা খুব বেশি একটা পার্থক্য সূচনা করতে পারেনি জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে।
প্রাচীন ভারতবর্ষে
আগেকার ভারতীয়দের বর্ননায় আছে চারপেয়ে এক দৈত্যাকার হাতি ধরে আছে পৃথিবীকে। আর সেই হাতিটিকে পিঠের উপর নিয়ে আছে অস্ত এক কচ্ছপ। আর একটি বিষাক্ত বিশালাকার নাগ বা সাপ কচ্ছপটিকে পেচিয়ে ধরে আছে। এই প্রাণীগুলোর একটাও যদি নড়ে ওঠে তবেই ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। ভারতীয় বেশ কয়েকটি শাস্ত্রেও এর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। অবশ্য সমকালীন অনেক গবেষকই এই ব্যাখ্যাটিকে পুরোপুরি মিথ বলতে রাজি নন। তাদের মতে, এই রুপকগুলোর অন্তরালেই আছে কোনো বৈজ্ঞানিক সত্য।

প্রাচীন জাপান
প্রাচ্যের জাপানের প্রাচীনকালের মানুষ বিশ্বাস করতেন যে, নামাযু নামের বিশাল এক দুই মাথাওয়ালা ক্যাটফিশের কারণে ভূমিকম্প হয়। আর এই নামাযুর বাস পৃথিবীর কেন্দ্রে বলেও তারা বিশ্বাস করতো। জাপানের মিথে আছে, নামাযু তার বিশাল লেজ দিয়ে পৃথিবীর উপরিতলকে তছনছ করে দেবার জন্য নাড়তে থাকলে একজন উপদেবতা থাকেন যিনি নামাযুকে শক্ত করে ধরে রাখেন। কাশিমা নামের ওই উপদেবতা শেষমেষ একটা বিশাল পাথর দিয়ে ক্যাটফিশের মাথায় আঘাত করে। এতে নামাযু ঠান্ডা হন তবে কাশিমা দুর্বল হয়ে পরলে ক্যাটফিশটির মাথা থেকে যখন ওই পাথরটি গড়িয়ে পরে তখনই ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।
প্রাচীন রোম এবং গ্রিস
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা দেখতে পাই ভূমিকম্পের কারণ হিসেবে ক্রোধান্বিত কোনো দেবতাকেই দোষারোপ করা হচ্ছে। গ্রিকরা এক্ষেত্রে সমুদ্রের দেবতা পসাইডনের দিকে আঙুল তুলেছিল। অন্যদিকে রোমানরা লাভা আর ধোয়ার দেবতা ভলকানুসকে দোষারোপ করে। মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে দেবতারা যখন অসন্তুষ্ট হন তখনই দেবতাদের ক্রোধে পৃথিবীতে ভূমিকম্প হয়।

পেরুর মাইমাস গোষ্ঠি
পেরুর প্রাচীন আদিবাসী গোষ্ঠি মাইমাসরাও ভূমিকম্পের জন্য দেবতাকে দায়ি করতেন। তবে এক্ষেত্রে দেবতার ক্রোধের কারণে ভূমিকম্প নয়, উল্টো দেবতার পূজারীর সংখ্যা নির্নয়েই এই ভূমিকম্প হয় বলে তাদের বিশ্বাস ছিল। তারা মনে করতো, দেবতা যখন পৃথিবীর উপর দিয়ে হাটেন তখনই ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। সত্যিকারের ভক্ত বা অনুসারীদের দেখার জন্যই তিনি হেটে বেড়ান। আর তাইতো, ভূমিকম্প হলে মানুষ কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি শুরু করে এবং ‘আমি এখানে, আমি এখানে’ বলে চিৎকার করতে থাকে। বর্তমান সময়ে আমাদের কাছে এসব নিছকই গল্প হিসেবে উপস্থাপিত হলেও, সেই সময় সমাজ জীবনে এসব গল্পের অনেক প্রভাব ছিল।
এরিস্টটল
দার্শনিক এরিস্টটলের ব্যাখ্যাতেই সর্বপ্রথম ভূমিকম্পের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার সূত্রপাত ঘটে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। এরিস্টটল ভূমিকম্পের জন্য দায়ি মনে করতেন বায়ু এবং পৃথিবীর অবস্থানকে। এছাড়াও ভূমিকম্পে শব্দের অনেক ভূমিকা ছিল বলেও তিনি মনে করতেন। আধুনিক বিজ্ঞানীরা বলছেন, এরিস্টটল শব্দ দ্বারা যে স্তর দুটোর কথা বোঝাতে চেয়েছিলেন তা মূলত বর্তমান সময়ে আবিস্কৃত টেকটোনিক প্লেট। তারপরেও এরিস্টটল ভূমিকম্প নিয়ে অতটা নিখুত ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। কিন্তু এটা সত্যি যে, তিনিই প্রথম বৈজ্ঞানিক এবং গাণিতিক পন্থায় ভূমিকম্প নিরুপণের চেষ্টা করছিলেন।

বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ভূমিকম্পকে নানান কায়দায় বর্ননা করার চেষ্টা করা হয়েছে। আর প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ব্যাখ্যায় অতি ক্ষমতাধর কোনো প্রাণী বা ব্যক্তিকে দেখতে পাই আমরা। যেমন ধরা যাক মেক্সিকোর কথাই। মেক্সিকোর প্রাচীন মানুষ বিশ্বাস করতো যে, একধরনের অতিকায় চিতাবাঘের কারণে ভূমিকম্প হয়। তাই ভূমিকম্পে যত মানুষ মারা যেত তৎকালীন মেক্সিকোতে, ধরে নেয়া হতো যে তারা সবাই ওই বাঘের শিকার হয়েছেন। তেমনি প্রাচীন ক্রীট ও রাশিয়ায় ষাড়, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কুকুর এবং ভারতীয়শাস্ত্রে হাতিকে ভূমিকম্পের জন্য দায়ি করা হয়েছে।

No comments